বিশ্বে প্রায় সমস্ত বৈজ্ঞানিকই মহাকাশের বিভিন্ন রহস্য খোঁজার এবং সমাধান করার চেষ্টা করছে। কারণ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড  রহস্যই পরিপূর্ণ রয়েছে। যেগুলির মধ্যে মানুষ অল্প মাত্রই সন্ধান করতে সক্ষম হয়েছে। এই রহস্যকেই জানার জন্য ভারতীয় সাইন্টিস্টগণ একের পর এক স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে। যেমন কিছুদিন আগেই চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে চন্দ্রযান-৩ এর সঠিকভাবে লেন্ডিং করিয়েছে ভারতীয় স্পেস এজেন্সি ISRO.

Photo by isro.gov.in

চন্দ্রযান-3 সঠিকভাবে লেন্ডিং করার কিছুদিন পর, সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য 2023 সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদিত্য-L1 নামে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে ISRO । কারণ সূর্যই সৌরজগতের একমাত্র শক্তির উৎস। যার দ্বারা পৃথিবীতে আলো আসে। এবং আজকাল পৃথিবীর সমস্ত দেশই পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিকে ভবিষ্যতে ব্যবহারযোগ্য একমাত্র শক্তির উৎস হিসেবে দেখতে চাইছে। কারণ এই শক্তির কোন শেষ নাই। ক্ষণিকের জন্য যদি শেষও হয়ে যায় তাহলে পুনরায় তা ফিরে আসে।

আজ আমাদের কাছে সৌরশক্তিকে ব্যবহার করার জন্য যে টেকনোলজি রয়েছে তা সম্পূর্ণ এসিসিয়েন্ট নয়।  যার কারণে সৌরশক্তিকে এখনো পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। তাই বর্তমানে যে টেকনোলজি রয়েছে তার উন্নতি ঘটনার জন্য সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই ISRO আদিত্য-L1 নামে স্যাটেলাইটকে সূর্যের কক্ষপথে প্রেরণ করছে।

এখন পর্যন্ত ভারত ছাড়া আমেরিকা, জাপান এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। যেগুলির মধ্যে Helios, Pioneer, Parkar solar probe, Cusp, solar orbitar, Hinode উল্লেখযোগ্য।

শ্রীহরিকোটার স্পেস সেন্টার থেকে PSLV-C57 রকেটের মাধ্যমে আদিত্য-L1 কে লঞ্চ করা হয়। এটিকে Lagrange point L1 এর Helo অরবিটে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যার জন্য স্যাটেলাইটটিকে প্রায় 15 লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। সমস্ত বাঁধা অতিক্রম করে 06/01/2024 এ স্যাটেলাইটটি গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়। Lagrange point L1 থেকেই সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করবে।

লঞ্চ করা থেকে গতিপথের বিবরণ

এটিকে লঞ্চ করার জন্য PSLV XL launch vehicle কে ব্যবহার করা হয়েছে। এই রকেটটি polar launch vehicle এর আপগ্রেডেড ভার্সন, যার কারণে একে PSLV extended length বলা হয়ে থাকে। এর সাহায্যে চন্দ্রযান-1 , মঙ্গলযান, অস্ট্রোস্যাট মিশনকে সম্পূর্ণ করা হয়েছিল।

এটি চারটি স্টেজের লঞ্চ ভেইকেল। প্রথম স্টেজে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো এবং বড় সলিড রকেট বুস্টার ব্যবহার করা হয়। এখানেতে ফিউল রূপে HTPB অর্থাৎ “হাইড্রোক্সিল টারমিনেটেড পলিবিটাডাইন” ব্যবহার করা হয়।

এর দ্বিতীয় স্টেজ লিকুইড স্টেজ, বিকাশ ইঞ্জিনের দ্বারা পাওয়ার পাই। এখানেতে জ্বালানি হিসেবে UDMH অর্থাৎ “আনসাইমেট্রিক্যাল ডাইমিথাইল হাইড্রোজেন” ও অক্সিডাইজার রূপে নাইট্রোজেন টেট্রক্সাইড ব্যবহার করা হয়।

তৃতীয় অংশটি প্রথম অংশটির মত সলিড স্টেজ। এখানে কেউ জ্বালানি হিসেবে HTPB অর্থাৎ “হাইড্রোক্সিল টারমিনেটেড পলিবিটাডাইন” ব্যবহার করা হয়ে।

চতুর্থ অংশটি লিকুইড স্টেজ।  এখানে জ্বালানি হিসেবে মনোমিথাইল হাইড্রোজেন ও নাইট্রোজেনের মিক্সড অক্সাইড কে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

:: সর্বপ্রথম আদিত্য-L1 কে PSLV-C57 রকেট লাঞ্চারে যুক্ত করা হয়েছে। এবং শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে একে লাঞ্চ করা হয়েছে। লাঞ্চ হয়ে ৮০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে একে স্থাপন করা হয়। এরপর স্পেস ক্রাফটি এই কক্ষপথেই ঘুরতে থাকবে এবং একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে গিয়ে পৃথিবীর গ্রাভিটির বাইরে প্রবেশ করানো হবে। এরপর থেকে লাগরাঞ্জ পয়েন্ট L1 যাওয়ার পথ শুরু হবে। এই lagrange point যেতে আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটটির প্রায় চার মাস সময় লাগতে পারে।

লাগরাঞ্জ পয়েন্ট (lagrange point) কি

lagrange point বলতে এমন একটি পয়েন্টকে বোঝায় যেখানেতে সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদের মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রায় সমান থাকে। অর্থাৎ যদি সূর্য ও পৃথিবীর কথা বলি, এবং ওই লাগরাঞ্জ পয়েন্টে কোন বস্তু রাখা হয়, তাহলে না পৃথিবী বস্তুটিকে নিজের দিকে আকর্ষণ করবে না সূর্য করবে। সুতরাং ওই পয়েন্টে কোন বস্তুকে রাখলে বস্তুটি স্থির থাকে। তাই পৃথিবী এবং সূর্যের মাঝের লাগরাঞ্জ পয়েন্টে আদিত্য-L1 কে স্থাপন করলে স্যাটেলাইটটি সেখানে স্থির থাকবে, এবং স্যাটেলাইটটিকে চালানোর জন্য তেমন জ্বালানির প্রয়োজন হবে না।

দুটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিশিষ্ট বস্তুর মধ্যে পাঁচটি লাগরাঞ্জ পয়েন্ট হয়ে থাকে। তাই সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যেও পাঁচটি লাগরাঞ্জ পয়েন্ট রয়েছে। সেগুলি হল L1, L2, L3, L4 এবং L5 সমুহ।

L1 পয়েন্টটি সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝ বরাবর রয়েছে। এই L1 পয়েন্টে আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটকে প্রতিস্থাপন করা হবে। এর জন্য আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটকে প্রায় দেড় লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে যেতে হবে। এই দূরত্বটি মাত্র পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের এক শতাংশ। L1 লাগরাঞ্জ পয়েন্টে পৌছানোর পর স্যাটেলাইট থেকে একটি Helo নামক কক্ষপথে স্থাপন করা হবে।

পেলোডসের বিবরণ (Payloads)

আদিত্য-L1 এ সাতটি পেলোড যুক্ত করা হয়েছে। 

Photo by isro.gov.in

প্রথম পেলোড

প্রথম পেলোড  হল VELC অর্থাৎ “visible emission line Coronagraph”. সূর্যের ভিতরের অংশে মোট তিনটি স্তর রয়েছে। যথাক্রমে কোর, রেডিয়েটিভ জোন, তারপর  কনভেকশন জোন। এবং বাইরে মোট তিনটি অংশ রয়েছে। সেগুলি যথাক্রমে ফটোসফেয়ার, ক্রমশফেয়ার, ট্রানজিসান রিজেন, ও একেবারে বাইরের অংশ কোরোনা। এই পেলোডের প্রথম কাজ হল করোনার স্তরটিকে পর্যবেক্ষণ করা। এরসঙ্গে   coronal mass ejection স্টাডি করা।

দ্বিতীয় পেলোড

এর দ্বিতীয় পেলোড হল SUIT অর্থাৎ “solar ultraviolet imaging telescope”. এটি সূর্যের ফটোসফেয়ার এবং ক্রমশফেয়ার স্তরকে পর্যবেক্ষণ করবে।

তৃতীয় ও চতুর্থ পেলোড

তৃতীয় পেলোড হল SOLEXS অর্থাৎ “solar low energy x-ray spectrometer”. এবং চতুর্থ পেলোড হল HEL10S অর্থাৎ “high energy L1 orbiting x-ray spectrometer”.  এই দুটো পেলোডের কাজ প্রায় একই। সূর্য থেকে যে X-ray flares নির্গত হয়, সেগুলিকে পর্যবেক্ষণ করা হল এই দুটি পেলোডের কাজ।

পঞ্চম পেলোড

পঞ্চম পেলোড হল ASPEX অর্থাৎ “Aditya solar wind particle experiment”. এর কাজ হল সোলার উইন্ডে থাকা প্রোটন কনা গুলিকে পর্যবেক্ষণ করা।

ষষ্ঠ পেলোড

ষষ্ঠ পেলোড হল PAPA অর্থাৎ “plasma analyser package for Aditya”. এর কাজ হল সোলার উইন্ডে থাকা ইলেকট্রন কোনা গুলিকে পর্যবেক্ষণ করা।

সপ্তম পেলোড

সপ্তম পেলোডটি হল MAG অর্থাৎ “advanced try-axial high resolution digital magnemetre” . এর কাজ হল L1 লাগরাঞ্জ পয়েন্টের ইন-সিটু ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে পরিমাপ করা।

আদিত্য-L1 এর উদ্দেশ্য

প্রথমত, এটি ভারতের কাছে প্রথম সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য মিশন। এর আগে ও পরে ভারত সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য কোন স্যাটেলাইট পাঠায়নি। এবং খুবই অল্প বাজেটে বড় একটি মিশন সম্পন্ন হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এটি সূর্য থেকে যে রেডিয়েশন নির্গত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করবে। এবং সূর্যের ভেতরের লেয়ার ও বাইরের তাপমাত্রার তারতম্যকে গবেষণা করবে।

তৃতীয়ত, সূর্যের যে বিভিন্ন স্তর রয়েছে সেগুলির কার্যপ্রণালীগুলি সম্পর্কেও গবেষণা করবে।

 চতুর্থত, সূর্য অন্যান্য গ্রহের উপরে কি ধরনের প্রভাব ফেলছে, সে সম্পর্কেও গবেষণা করবে।

পঞ্চমত, সূর্যের মধ্যে যদি এমন কোন বিস্ফোরণের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা সৌরমন্ডলের অন্যান্য গ্রহ বা মহাকাশে লঞ্চ করা বিভিন্ন স্যাটেলাইট গুলিকে ক্ষতি করতে পারে, সেই সম্পর্কে গবেষণা করে আগে থেকে তথ্য জানতে সাহায্য করবে এই আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটটি।

Conclusion

সূর্যই হচ্ছে পৃথিবীতে আলো ও তাপের একমাত্র প্রধান উৎস। যার ফলে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে। তাই সূর্যকে ভালোভাবে স্টাডি করলে পৃথিবীতে আরও ভালোভাবে জীবের বিকাশ যেমন ঘটানো সম্ভব, তেমনি সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিকে আরও বেশি উন্নত ঘটানো সম্ভব হবে। এইসব দিক থেকে বিচার করলে আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটটি বিভিন্ন দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

FAQ

Q) আদিত্য-L1 কি?

আদিত্য-L1 হলো একটি কৃত্রিম উপগ্রহ। যা সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য লাঞ্চ করা হয়েছে।

Q) আদিত্য-L1 কবে লঞ্চ করা হয়?

02 সেপ্টেম্বর 2023 তারিখ, 11:50am (ভারতীয় টাইম) এর সময় আদিত্য-L1 লঞ্চ করা হয়।

Q) আদিত্য-L1 কোথা থেকে লঞ্চ করা হয়?

আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটটি শ্রীহারিকোটার “সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার” থেকে সূর্যের উদ্দেশ্যে লঞ্চ করা হয়।

Q) আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটটি কবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়?

06 জানুয়ারি 2024 তারিখ, বিকেল 4:00pm (ভারতীয় টাইম) এর সময় গন্তব্যস্থলে প্রতিস্থাপন করা হয়।

Q) আদিত্য-L1 স্যাটেলাইটে কটি পেলোড রয়েছে?

আদিত্য-L1 এ সাতটি পেলোড রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *