চন্দ্রযান-3 এর সফল ল্যান্ডিংয়ের পর, ভারত সমুদ্রকে গবেষণা করার জন্য সমুদ্রেযান মিশনের প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়েছে। 23শে আগস্ট 2023-এ চন্দ্রযান-3 চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করা একমাত্র প্রথম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এমনকি চন্দ্রযান-3 ল্যান্ডিংয়ের কিছুদিনের মধ্যে আলাদা আলাদা 9 ধরনের উপাদানের খোঁজ করে ভারতের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতাকে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরে। বৈজ্ঞানিক ক্ষমতাকে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরে।

Image by ImaArtist from Pixabay

আজ পর্যন্ত চাঁদেতে 12 জন মহাকাশচারীকে চাঁদেতে পাঠানো হয়েছে। বৈজ্ঞানিকেরা মনে করে মহাকাশে ব্যক্তিদেরকে পাঠানোর চেয়ে পৃথিবীর সমুদ্রে মানুষকে পাঠানো অনেক বেশি কষ্টকর ব্যাপার। রিপোর্ট অনুযায়ী চাঁদের প্রায় বিভিন্ন জায়গা অনুসন্ধান করা গেলেও, আজ পর্যন্ত সমুদ্রের মাত্র পাঁচ শতাংশ অংশকেই অনুসন্ধান করা গিয়েছে। এবং বাকি 95% অংশে কিরকম জীবজন্তু এবং জলের ধরন রয়েছে সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করা আজ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।

চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহকে গবেষণা করার মত পৃথিবীর সমুদ্রকেও গবেষণা বা অনুসন্ধান করার জন্য ভারত একটি নতুন মিশন শুরু করতে যাচ্ছে, আর সেটি হল সমুদ্রযান মিশন। যেমনটা চন্দ্রযান মিশন চাঁদের বিভিন্ন রহস্যকে আমাদেরকে জানতে সাহায্য করছে, তেমনই সমুদ্রযান মিশন সমুদ্রের বিভিন্ন অজানা রহস্যকে আমাদের জানতে সাহায্য করবে।

সমুদ্রযান মিশন

সমুদ্রযান মিশন ভারতের এমন একটি প্রকল্প, যেখানেতে তিনজন বৈজ্ঞানিককে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান করার জন্য পাঠানো হবে। এই তিনজন বৈজ্ঞানিক সমুদ্রের প্রায় 6000 মিটার পর্যন্ত যাবে, এবং সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের অনুসন্ধান করবে।

এই সমুদ্রযান মিশনটিকে 2018 সালে শুরু করা হয়েছিল, 2024 সালের শেষের দিকে বা 2025 সালে সম্পন্ন করা হবে। এই মিশনের জন্য বিভিন্ন ধাপে প্রায় 8000 কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ।

আপনারা অনেকেই জানেন পৃথিবীর প্রায় 70 ভাগ অংশই জল দ্বারা ঢাকা রয়েছে। যার বেশিরভাগ অংশই সমুদ্র বা মহাসমুদ্রের মধ্যে পড়ে। বৈজ্ঞানিকদের মতে এই সমুদ্রের সৃষ্টি আজ থেকে প্রায় চার আরব সাল আগে হয়েছিল।

সমুদ্র তৈরির প্রক্রিয়া

হাজার হাজার বছর আগে মহাকাশের বিভিন্ন উপাদান গুলির একে অপরের সঙ্গে ধাক্কার ফলে বিভিন্ন ধরনের উল্কাপিণ্ড ও ধুমকেতু পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। যেগুলির কেন্দ্রে বরফ ছিল, যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এবং উল্কাপিণ্ড ও ধুমকেতুর ভেতরে থাকা বরফগুলি গলতে শুরু করে।

তাপমাত্রা প্রচুর থাকার কারণে বরফগুলি জলে পরিনত না হয়ে জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। এই জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু মেঘে পরিণত হয়। এই মেঘ থেকে হাজার হাজার বছর ধরে বৃষ্টির ফলে সাগর বা মহাসাগর গুলোর সৃষ্টি করে। যা পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগেরও বেশি অংশকেই জল দ্বারা ঢেকে রেখেছে।

সমুদ্ররের নীচের অংশের বিবরণ

এই সমুদ্রের নিচেও স্থলভাগের মত ল্যান্ড বা ভূমি রয়েছে। পৃথিবীর স্থলভাগই যেমন পাহাড়-পর্বত বা উপত্যকা রয়েছে, তেমনি সমুদ্রের নিচেও এই ধরনের অনেক স্ট্রাকচার রয়েছে। এই সমুদ্রের নিচেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। যেগুলি প্রায় অগ্নুৎপাত ঘটায়, এবং এইগুলিকেই রিসার্চ করার জন্য বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।

সমুদ্রের নিচের বিভিন্ন উপাদান গুলিকে যদি পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে এর অতীত যেমন জানা সম্ভব হবে এর সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিস্থিতিও জানা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে সমুদ্রের কোন অংশে মিনারেল ওয়াটার রয়েছে তারও সন্ধান করা সম্ভব হবে।

মিশন সম্পর্কীত আরও তথ্য

এটি ভারতের প্রথম “MANNED OCEAN MISSION” অর্থাৎ যার মাধ্যমে মানুষকে সমুদ্রের গভীরে পাঠানো হবে। গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর বৈজ্ঞানিকেরা সমুদ্রের বিভিন্ন উপাদানগুলিকে গবেষণা করবে, এবং গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করবেন।

জানানো হয়েছে, এই মিশনের মাধ্যমে সমুদ্র জীবের কোন সমস্যা হবে না। কারণ এমনি সাধারণভাবে অনেক মিশন রয়েছে, যেগুলির দ্বারা সমুদ্রের বিভিন্ন জীব গুলোকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এই মিশনের মাধ্যমে হবে না।

এই মিশন “ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন” (ISRO) এবং “ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওসিয়ান টেকনোলজি” ( NIOT) এর সমন্বয়ে করা হচ্ছে। সমুদ্রযানের সঙ্গে স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটিকে যুক্ত করার জন্য ISRO এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যার মাধ্যমে সমুদ্রযানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। এবং সমুদ্রযানটিতে কোন সমস্যা দেখা দিলে যাতে করে সমুদ্রযানটিকে ট্রাক করে খুঁজে পাওয়া যায়।

সমুদ্রযান মিশনটি সম্পূর্ণ করার জন্য মেশিন

এই মিশনটিকে সম্পূর্ণ করার জন্য দুটি বাহন ব্যবহার করা হবে। একটি হল ROVS অর্থাৎ “remotely operated vehicles”, এবং অপরটি হল AUVS অর্থাৎ” autonomous underwater vehicles”.

ROVS এমন এক ধরনের বহন হবে যেটিকে মানুষের দ্বারা কন্ট্রোল করা যাবে, তবে নিজে থেকে কন্ট্রোল হবে না। কিন্তু AUVS বাহনটি সম্পূর্ণভাবে অটোমেটিক কাজ করবে।

সমুদ্রযান মিশনের কাজ

ওপরেই বলা হয়েছে সমুদ্রযান মিশনটি সমুদ্রের বিভিন্ন উপাদানের পর্যবেক্ষণ করবে।

সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি – গ্লোবাল ওয়ার্মিং ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি দিন দিন সমুদ্র জলের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই প্রতিবছর সামুদ্রিক জলের তাপমাত্রা কি পরিমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে সেগুলি সম্পর্কে জানায় এই মিশনের একটি উদ্দেশ্য।

কারণ এই বৃদ্ধি পাওয়া তাপমাত্রা সমুদ্র সমুদ্রে থাকা বরফ গুলিকে গলাচ্ছে এবং যার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলতল ধিলে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং স্থলভাগের নিচু জায়গা গুলো জলমগ্ন হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সমুদ্র জলের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি সমুদ্রে থাকা প্রাণীকুলের পক্ষেও প্রতিবন্ধীকতা সৃষ্টি করবে। তাই সমুদ্র জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ জানা খুবই প্রয়োজন।

তাছাড়া, বিভিন্ন দেশের বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা সংগ্রহীত তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য মহাসাগরের তুলনায় ভারত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জন্য ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এই কারণও অনুসন্ধান করা মিশনটির একটি অন্যতম উদ্দেশ্য।

পানীয় জলের খোঁজ – মিশনটির আরেকটি উদ্দেশ্য হল, সমুদ্রের গভীরে কোথাও পানীয় জলের ভান্ডার থাকলে তার খোঁজ করা।

জীব ও উপাদানের খোঁজ – সমুদ্রের তলদেশে বহু অজানা জীব এবং উপাদান রয়েছে সেগুলিরও খোঁজ করা।

মিশনের যন্ত্র ও গভীরতা

এই মিশন দিকে সম্পূর্ণ করার জন্য মৎস-6000 ( MATSYA- 6000) নামের একটি সাবমারসিবলকে তৈরি করা হচ্ছে । এই সাবমারসিবলটি সমুদ্রের 6000 মিটার গভীরে গিয়ে সমুদ্রের পর্যবেক্ষণ করবে। এর আগেও বলেছি, এই সাবমারসিবলটিতে তিনজন ব্যক্তির বসার জায়গা থাকবে।

মিশনটির কঠিনতা

বন্ধুরা, এই মিশনটি সম্পর্কের শুনে যতটা সহজ মনে হলেও তার থেকেও হাজার হাজার গুনে বেশি কঠিন। আপনারা শুনে অবাক হবেন সমুদ্রের ৬০০০ মিটার গভীরতাতে যাওয়া মানে চাঁদে যাওয়ার থেকেও বেশি কঠিন।

চাঁদ আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় 3,84,000 কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তবুও চাঁদেতে গিয়ে কোন কিছু অনুসন্ধান করার থেকেও, সমুদ্রের 6000 কিলোমিটার নিচে গিয়ে অনুসন্ধান করা অনেক বেশি কঠিন কাজ। এই কঠিনতার অনেক কারণ রয়েছে, তবে বৈজ্ঞানিকরা চাপ এবং কোন কিছু নির্ণয় করার কাজকে প্রধান দুটি কারণ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

কারণ 6000 কিলোমিটার গভীরতায় চাপ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় 600 গুন বেশি থাকে। যা কোন কিছুকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মুড়ে মরছে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। যেমনটা কোন হাইড্রলিক মেশিনে অত্যাধিক পরিমাণে চাপ দিলে বস্তুটির যা অবস্থা হয়। বা 6000 কেজি করে 100 টি হাতিকে কোন ব্যক্তির উপরে দাঁড় করালে ব্যক্তিটির যে অবস্থা হবে, তার সমতুল্য চাপ 6000 মিটার গভীরতায় থাকে। যেমনটা, কয়েক মাস আগে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষকে দেখতে যাওয়া টাইটেন সাবমার্সিবিলিটির হয়েছিল।

তবে ভারতের এই সাবমার্সিবলটিকে বিভিন্ন দিকে চিন্তা ভাবনা করে খুবই যত্নসহকারে বানানো হচ্ছে। এবং ওই সাবমারসিবলটি জলের ওই চাপকে যদি সহ্য করে নিতে পারে তাহলে এমনিতেই মিশনটি অর্ধেক সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ 6,000 কিলোমিটার গভীরতাই 6,00,000 কেজির চাপ থাকে, যা এর ওপরেই উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ, সমুদ্রের 6000 কিলোমিটার গভীরতায় এতটাই অন্ধকার থাকবে যে কোন কিছু নির্ণয় করা খুবই কষ্টকর ব্যাপার হয়ে যাবে।

সমুদ্রেযানে ক্যামেরা ও আলোর বিবরণ

বৈজ্ঞানিকদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের 200 মিটার পর সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না, ফলে সম্পূর্ণ অন্ধকার হতে থাকে। যার কারণে MATSYA- 6000 নামের সাবমারসিবলটিতে লাইট এবং ক্যামেরা লাগানো হবে। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সাবমারসিবলটিতে 12টি ক্যামেরা সহ বিভিন্ন ধরনের লাইট যুক্ত করা হবে। যাতে করে সমুদ্রতল দেশের জীবজন্তু সহ বিভিন্ন ধরনের উপাদান গুলির ছবি তোলা হয়।

Conclusion

এটি ভারতের সমুদ্র গবেষণার একটি ছোট্ট অংশ। তবে এর কাজ ও উদ্দেশ্য অনেক রয়েছে। এই মিশনের মাধ্যমে সামুদ্রিক বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র এবং উপাদান, পানীয় জল ও কোন কিছুর পরিবর্তনের কারণ গুলি সম্পর্কে যেমন জানতে সাহায্য করবে, তেমনি সমুদ্রের মধ্যে ঘটা কোন বিপর্যয় সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করবে। এইসব দিক থেকে বিচার করলে সমুদ্রযান মিশনটির গুরুত্ব অপরিসীম হতে পারে।

FAQ

সমুদ্রযান মিশন সমুদ্রের কত গভীরে যাবে?

সমুদ্রযান মিশনের মাধ্যমে জলের 6000 মিটার গভীরতায় যাওয়া হবে।

সমুদ্রযান মিশনের উদ্দেশ্য কি?

সমুদ্রের গভীরে গিয়ে সেখানকার বাস্তুতন্ত্র এবং বিভিন্ন উপাদান গুলি সম্পর্কে গবেষণা করা সমুদ্রযান মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য

সমুদ্রযান মিশনের মাধ্যমে কতজন ব্যাক্তি সমুদ্রের গভীরে যাবে?

সমুদ্র যান মিশনের মাধ্যমে তিনজন বৈজ্ঞানিক সমুদ্রের গভীরে যাবে বিভিন্ন গবেষণার জন্য।

সমুদ্রযান মিশনে বৈজ্ঞানিকেরা কিভাবে সমুদ্রের গভীরে যাবে?

বৈজ্ঞানিকেরা MATSYA- 6000 নামক সাবমারসিবলের মাধ্যমে সমুদ্রের 6000 মিটার গভীরতায় যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *