বর্তমানে জীব প্রযুক্তি বিদ্যার সম্বন্ধে জ্ঞান মানুষকে অনেকখানি উন্নীত করেছে। এবং প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে পরিবেশকে কলুষমুক্ত করার কথা বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। এ প্রসঙ্গে প্রথমে ‘জীব প্রযুক্তি কি’ – তা জানা দরকার। বর্তমানকালের একটি উদ্ধৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী “জীব প্রযুক্তি হল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিয়ম-নীতির প্রয়োগ করে, জীবিত উপাদানের দ্বারা কোন পদার্থ উৎপাদন করা”। একাজের জন্য বা এ বিষয়ে জ্ঞানের জন্য অন্যান্য অনেক বিষয় থেকে উপাদান সংগ্রহ করা যায়। সেগুলি হল জীবাণুবিদ্যা, জৈব রসায়ন, রসায়ন প্রযুক্তি, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, কৃষিবিদ্যা, বংশগতিবিদ্যা ইত্যাদি।

Image by Pexels.com

বিবিধ পরিবেশে জীবাণুর চাষ করে তাদের অভিযোজন ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশকে স্বাভাবিক করা, জীবাণু দ্বারা উৎপাদিত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উৎপাদন হার বাড়ানো, উচ্চ ফলনশীল উদ্ভিদ এবং প্রাণীর সৃষ্টি ও তাদের চাষ বা প্রতিপালন, বিবিধ ঔষধ, ভ্যাকসিন প্রস্তুতি, ইত্যাদি মানবকল্যাণের কাজে জীব প্রযুক্তিবিদ্যা সর্বদা নিযুক্ত।

সংক্ষিপ্ত করে বললে – দূষণের হাত থেকে বাঁচার জন্য কিংবা দূষণ না করেও সামাজিক বিকাশ অব্যাহত রাখার জন্য জীব প্রযুক্তির প্রয়োগ হলো পরিবেশগত জীব প্রযুক্তিবিদ্যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হল দূষণকারী অপদ্রব্যগুলিকে বিয়োজিত করার জন্য জীবাণুকুলকে ব্যবহার করা, তাদের পরিবর্তিত করা ইত্যাদির মাধ্যমে শিল্পজাত পদার্থ গুলিকে পুনরায় পরিবেশে ব্যবহারোপযোগী সামগ্রীতে রূপান্তরিত করা ও পরিবেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

📝 জীব প্রযুক্তিবিদ্যা সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা (what is biotechnology)

আগেই বলা হয়েছে জৈব প্রযুক্তিতে জীবিত উপাদানকে কাজে লাগানো হয়। এখন এগুলি কি কি উপায়ে কাজে লাগানো হয় তা সম্বন্ধে ধারণা করতে হলে কতকগুলি বিষয় জানতে হবে –

👉 জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি

সহজ কথায় জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে বোঝায়, কোন জীবের ‘জীন’ (gene ) অন্য কোন জীবের জিনোমের অন্তর্ভুক্তি করা। আমরা জানি যে জীন হল বংশগতি বৈশিষ্ট্যের একক। এক একটি জীন হল DNA এর খন্ড বা অংশ বিশেষ। DNA অনু কোষের মধ্যে অবস্থিত একটি বিশাল পেঁচানো অনু, যা অনেকগুলি জীনের সমন্বয়ে গঠিত। DNA অনু একটি প্যাঁচানো দ্বিতন্ত্রী বৃহৎ অনুর অংশবিশেষ একটি নির্দিষ্ট কার্যের জন্য দায়ী। এইরকম প্রতিটি অংশকে বলে জীন। জীন কেটে কোন কোষের ক্রোমোজোমে স্থানান্তরিত করণের মাধ্যমে নতুন চরিত্রের নতুন জীব উৎপন্ন করা হয়।

প্রতিটি জীনর কার্য করি তাই জীবের পৃথক পৃথক চরিত্র প্রকাশ পায়। তাই কোন কোষে কোনো বাহিরের জীন প্রবেশ করালে তা প্রকাশিত হয় ও নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এইভাবে জীন কাটা ছেঁড়া করে কোন জীবের মধ্যে তার স্থানান্তর ঘটিয়ে বিবিধ চরিত্রের বিন্যাস করাই হল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বারা নতুন নতুন চরিত্রের জীবাণু তৈরি করা হয় ও তাদের নানাবিধ কাজে লাগানো হয়। এছাড়াও উদ্ভিদ বা প্রাণীকুলের উন্নততর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীর বিন্যাসও করা যায় এইভাবে।

👉 কলা পোষণ ( Tissue culture ) কি

উদ্ভিদ ও প্রাণীদের কোষকে পৃথকভাবে পুষ্টির সরবরাহ করে বাঁচিয়ে রেখে সেই কোষগুলিকে ইচ্ছামত পরিবর্তিত করা যায়। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পুষ্টির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে জীবিত কোষ সমষ্টি পালন করে সেখান থেকে নতুন উদ্ভিদ পর্যন্ত তৈরি হয়। একইভাবে প্রাণীদের ক্ষেত্রে ভ্রুনকে কলা পোষণের (Tissue culture) মাধ্যমে পালন করা যায়। এবং ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী তৈরি করা হয়।

👉 ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর সৃষ্টি কিভাবে হয়

ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ বা প্রাণী বলতে বোঝায় এমন উদ্ভিদ বা প্রাণী যাদের জিনোমের বাহির থেকে কোন জীনকে কৃত্রিমভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন জোনাকি পোকার আলো উৎপাদন নিয়ন্ত্রনকারী জীনগুলিকে গাছের জিনোমে প্রবেশ করে, গাছেও অনুরূপ ঝকমকে আলো উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।

👉 মিউটেশন বা পরিব্যক্তি কি

মিউটেশন বলতে বোঝায় কোন জীবের জেনেটিক গঠনে (DNA তে) কোন পরিবর্তন ঘটা। এরূপ পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে হয় আবার কৃত্রিমভাবেও প্রণোদিত করা হয়। যেসব উপাদান দ্বারা এরকম পরিবর্তন ঘটানো হয় তাদের মিউটাজেন বলে। মিউটেশনের ফলে জীবের পরিবর্তন হয় বলে জীবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তন। এরূপ পরিবর্তনে কিছু উপকারী পরিবর্তনও হয়। সাধারণত এককোষী জীবাণুকুলকে ( যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল ) এই উপায়ে পরিবর্তিত করে অনেক কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন- অধিক এন্টিবায়োটিক উৎপাদন, উৎসেচক উৎপাদন, এবং অধিক উষ্ণতা সহ্য করার ক্ষমতাধারী জীবাণুর সৃষ্টি ইত্যাদি।

👉 সংকরায়ন ( hybridization ) কি

ইতর পরাযোগ ঘটিয়ে উদ্ভিদের মধ্যে উপকারী বৈশিষ্ট্যাবলী এক উদ্ভিদে কেন্দ্রীভূত করা যায়। একই ভাবে নতুন ধরনের প্রাণীরও সৃষ্টি করা যায়। উদাহরণ হিসেবে উচ্চ ফলনশীল ফসল, রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা সম্পন্ন ফসল উৎপাদন। একই রকম ভাবে এমন প্রাণী সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে, যা একধারে অধিক মাংস উৎপাদন করে এবং মাংস অধিকতর পুষ্টিকর হয়।

উপরোক্ত বিষয়গুলির ভিত্তিতে পরিবেশ শোধনে বা রক্ষার্থে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়

📝 কৃষিকাজ, জৈব প্রযুক্তি ও পরিবেশ

ভারতের মতো উন্নয়নশীল কৃষিনির্ভর দেশে চাষবাসের সময় সার হিসেবে ইউরিয়া জাতীয় নাইট্রোজেন ঘটিত সার প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও ফসফরাস এবং পটাশিয়াম ঘটিত লবনও প্রয়োগ করা হয় জমিতে। এই জাতীয় সারগুলির উৎপাদন মূলক প্রচুর আবার, মাটিতে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। নাইট্রোজেন ঘটিত সারের লবণগুলি জল বাহিত হয়ে নিচু এলাকার জমিতে জমা হয় ও সেইসব জমিকে অনুর্বর করে তোলে।

এছাড়াও মাটির উপাদানের সহিত মিলিত হয়ে মাটিকে শক্ত করে তোলে। এরূপ শক্ত মাটির চাষের পক্ষে অনুপযুক্ত। সাধারণ গরু বা বলদে টানা নাঙ্গল দ্বারা এর দৃঢ়তা নষ্ট করা যায় না। তবে সাধারণত চাষীরা জমিতে সার দেওয়ার সময় গোবর সারও মিশ্রিত করে বলে জমির দৃঢ়তা হ্রাস পায়। তবে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ ও অতিরিক্ত নাঙ্গল করা অধিক ভূমিক্ষয়ের কারণ হয়।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সারের বিকল্প হিসেবে জীবাণুর ব্যবহার করার কথা ভাবছেন। পরিবেশে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে, যারা বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন গ্যাসকে আবদ্ধ করে মাটিতে নাইট্রোজেন ঘটিত লবণের বৃদ্ধি ঘটায়। আবার এমন কিছু ছত্রাক আছে যারা অজৈব ফসফেটকে উদ্ভিদের গ্রহণ উপযোগী ফসফেটে রূপান্তরিত করে।

এই সকল জীবাণুর পরিমাণ চাষ জমির মাটিতে বাড়াতে পারলে কৃষির ফসল চাষের জন্য মাটিতে সারের পরিমাণ আপনা থেকেই বেড়ে যাবে, ফলে মাটি উর্বর হবে। এই সকল জীবানু গুলিকে জীবাণুসার বা biofertilizer বলে। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হল –

১) স্বাধীনজীবী মৃত্তিকাস্থিত ব্যাকটেরিয়া

  • আজটোব্যাক্টর (Azotobactor)
  • ক্লষ্ট্রিডিয়াম (clostridium)
  • বেইজারিনকিয়া (Beizerinkia)
  • নোকারডিয়া (Nocardia)
  • ক্লেবসিয়েল্লা (Klebsiella)

২) স্বাধীনজীবী মৃত্তিকাস্থিত নিলাভ সবুজ শৈবাল

  • অ্যানাবিনা (Anabaena)
  • নষ্টক (Nostoc)

এরা ফার্ম জাতীয় উদ্ভিদের সঙ্গে মিথোজীবী হিসেবেও চাষ জমিতে জন্মায়

৩) মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া

  • রাইজোবিয়াম ( গুটিজাতীয় গাছের মূলে এরা মিথোজীবী হিসেবে গুটি তৈরি করে বাস করে)

এই সকল স্বাধীনজীবী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে পরীক্ষাগারে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করে জমিতে ছড়িয়ে দিলে মাটিতে উর্বরতা বাড়ে। যারা উদ্ভিদের মূলে গুটি তৈরি করে তাদেরও মাটিতে প্রয়োগ করে উপযুক্ত উদ্ভিদের চাষ করলে জমিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। উদ্ভিদের মূলে মিথোজীবী ছত্রাক হিসেবে কিছু প্রজাতি বসবাস করে। এদের সমষ্টিগতভাবে মাইকোরাইজা বলে।

এই সকল মাইকোরাইজাগুলি মাটির ফসফেটের গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়, ফলে যে উদ্ভিদের মূলে এরা বাস করে সেই উদ্ভিদদের বৃদ্ধি ও উৎপাদন হারও বাড়ে। তাই ফসলি উদ্ভিদটির বীজের সঙ্গে মাইকোরাইজার রেণু (spore), এবং নাইট্রোজেন আবদ্ধকারী ব্যাকটেরিয়ার দ্রবণ মিশিয়ে মাটিতে রোপন করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।

এ সকল পদ্ধতি অবলম্বন করলে একদিকে যেমন মাটিকে প্রস্তুত করবার খরচ কম হয় (কারণ রাসায়নিক সারের মূল্য বেশি), তেমনি মাটির ক্ষয়ও অনেকাংশে কম হয়। পদ্ধতিটি অনেক বেশি প্রাকৃতিক।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা আরো অনেক বেশি চিন্তা ভাবনা করছেন। তারা নাইট্রোজেন আবদ্ধকারী ব্যাকটেরিয়ার নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণ জিনকে কেটে নিয়ে মাইকোরাইজার জিনোমে স্থাপন করার কথা ভাবছেন। তাহলে কেবলমাত্র মাইকোরাইজা ছত্রাক ব্যবহার করে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস দুই একত্রে যোগান দেওয়া সম্ভব হবে।

আবার এই সকল জীনগুলিকে সরাসরি ফসলি উদ্ভিদের (ধান ও গম ইত্যাদি) কোষে স্থাপন করে সেখান থেকে নতুন চারা উৎপন্ন করতে পারলে এমন উদ্ভিদ পাওয়া যেতে পারে, যে সরাসরি বাতাস থেকে এই নাইট্রোজেন গ্রহণ করে আবদ্ধ করতে পারবে, কিংবা মাটি থেকে সরাসরি ফসফরাস গ্রহণ করতে পারবে, তাহলে সার প্রয়োগ দরকার হবে না। এতে জমির যে ক্ষতি হচ্ছে তা আর হবে না। তবে এই বিষয়ে এখনও বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয়নি।

Conclusion

কৃষিকার্যের কারণে আরেকটি বড় সমস্যা হল পরিবেশের কীটানূনাশক জনিত দূষণ। জীবাণুনাটক হিসেবে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থগুলি পরিবেশের পক্ষে যে কত ক্ষতিকারক তা বলে শেষ করা যাবে না। তাই রাসায়নিক পদার্থের বিকল্প হিসেবে বর্তমানে জীবাণুকুলের কোন কোন সদস্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন bacillus thuringiensis নামক ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া তার কোষে কেলাসিত কিছু পদার্থ তৈরি করে যা প্যারাস্পোরাল বস্তু (parasporal body) নামে পরিচিত। এই পদার্থটি পতঙ্গ শ্রেণীর প্রাণীদের পৌষ্টিকনালীতে জমা হয়ে পতঙ্গদের পরিপাক ক্রিয়া ব্যাহত করে ও পতঙ্গদের মৃত্যু ঘটায়।

সুতরাং এই ব্যাকটেরিয়াকে পরীক্ষাগারে উৎপাদন করে ফসলে স্প্রে করে জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ফলে কৃষির কাজে যে সকল ক্ষতিকারক রাসায়নিক জীবাণু নাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ব্যবহার অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে এবং অবাঞ্ছিত রাসায়নিক বর্জন করা সম্ভব হবে।

FAQ

জীব প্রযুক্তিবিদ্যা কাকে বলে?

জীবপ্রযুক্তির প্রয়োগে উন্নত মানব গোষ্ঠীর দ্বারা আর্থসামাজিক কারণে তার বিনষ্ট পরিবেশকে সুপরিচালোনা করে অনন্তকাল ধরে জীবনধারণের অনুকূল রাখার যে প্রয়াস তাকেই পরিবেশগত জীবপ্রযুক্তি (what is biotechnology) বলা হয়।

জীব প্রযুক্তি বিদ্যার জনক কাকে বলা হয়?

জৈব প্রযুক্তি বিদ্যার জনক হলেন জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল এরকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *