বন্ধুরা, কিছুদিন আগেই ভারত চাঁদে চন্দ্রযান-৩ পাঠিয়ে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। আরো বেশি মানুষকে হতভাগ করে তুলেছিল, যখন বিক্রম লেন্ডার চাঁদের দক্ষিণ মেরু অংশে কোন বাধা বিঘ্ন ছাড়াই সফট ল্যান্ডিং করেছিল।

All Photo by isro.gov.in

চন্দ্রযান-৩ যখন চাঁদের সাউথপল এলাকাতে যখন ভালোভাবে ল্যান্ডিং করে, তখন পুরো ভারতবাসী এটাকে নিয়ে খুবই উদযাপন করেছে। কারণ এর পূর্বে চন্দ্রযান-২ চাঁদের সাউথপুল এলাকাতে যখন পাঠানো হয়েছিল, সেখানেতে পৌঁছেতে গিয়েছিল কিন্তু কারণবশত লেন্ডার ক্র্যাশ হয়ে গিয়েছিল ল্যান্ডিংয়ের সময়।

কিন্তু, ওপরেতে যে টাইটেল দেওয়া হয়েছে, তা দেখে আপনাদের মনে হয়তো এই ধরনের প্রশ্ন জাগছে। সাইকেল কিভাবে রকেটকে চাঁদে পৌঁছানোর জন্য সাহায্য করতে পারে। আপনারা এই পোস্টটি সম্পূর্ণ পড়লে বুঝতে পারবেন, ভারতের চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহে পৌঁছানোর কষ্ট কিরূপ ছিল, এবং কি কি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বা সাইকেলই কিভাবে সাহায্য করেছিল।

শুরুতে ভারতের স্পেসমিশন খুবই দুর্বল ছিল, কারণ সেই সময় ভারতে স্পেস মিশন সংক্রান্ত সাইন্টিফিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার তেমন ছিল না, এবং ছিলনা তেমন অর্থের প্রত্তুলতা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, প্রথম অবস্থায় খুবই ধীরগতিতে ভারতের স্পেস মিশনের কাজ শুরু হয়। কিন্তু যদি দেখা যায় ভারত স্বাধীনতা হওয়ার খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই, ভারত স্পেস সংক্রান্ত মিশনে অনেক বড় বড় সাকসেস কিন্তু অ্যাচিভ করেছে। যা আমাদের সকলের কাছেই গর্ভের একটি বিষয়।

চন্দ্রযান-৩ লঞ্চিং ইতিহাস

চন্দ্রযান-৩ সাকসেসফুল ল্যান্ডিংয়ের পর ভারত চতুর্থ দেশ হয়ে গেল, চাঁদে সফট ল্যান্ডিং করা। এর আগে তিনটি দেশ চাঁদের সফট ল্যান্ডিং করেছিল, সেগুলি হল আমেরিকা , রাশিয়া ও চায়না । আর ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরু এলাকায় সফট ল্যান্ডিং করা প্রথম দেশ হয়ে গেল। কারণ এর আগে কোনো দেশিই কিন্তু চাঁদের ওই সাউথ ফুল এলাকাতে সফট ল্যান্ডিং করতে পারেনি।

ভারত এই পর্যন্ত চাঁদে তিনটি মিশন পাঠিয়েছে। প্রথমটি চাঁদের চাঁদের অরবিটে ঘুরছে, ওটি সাকসেসফুল মিশন ছিল। দ্বিতীয়টি চাঁদের ল্যান্ডিং করতে গিয়ে লেন্ডার ক্রাশ হয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় যা বর্তমানে পাঠানো হয়েছে এবং দক্ষিণ মেরুতে সফটওয়্যার ল্যান্ডিং হয়েছে।

চন্দ্রযান-৩ চাঁদে পৌছাতে প্রায় এক মাসের মতো সময় লেগেছিল। কিন্তু যেখানেতে রাশিয়ার লুনা মিশন চাঁদে পৌছাতে মাত্র তিন দিন সময় লেগেছিল, সেই জায়গায় চন্দ্রযান-৩ কেন এত বেশি সময় লাগিয়েছিল, এইরকম প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে? দেখুন রাশিয়ার লুনা মিশন ডাইরেক্ট স্ট্রেটেজি ব্যাবহার করেছিল। অপরপক্ষে চন্দ্রযান-৩ অনেক বেশি পে-লোড নিয়ে যাচ্ছিল, এবং যদি বেশি লোড নিয়ে যা হয় সেক্ষেত্রে পিউল ক্যাপাসিটিও কমে যায়, তাছাড়া আমাদের কাছে এর আগে এত বেশি লোড নিয়ে যাওয়া রকেট ছিল না বা এই ধরনের কোন রকেট ব্যবহার করা হয়নি।

এক্ষেত্রে ফিজিক্সের ফিনোমিনাকে ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘ পথকে অবলম্বন করা হয়েছে, যাতে কম ফিউলের ব্যবহার হয়। যা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের উদাহরণ বিশ্বের কাছে তুলে ধরা যায়।

ভারতের মঙ্গলযান লঞ্চের ঘটনা

উপরে আমি উল্লেখি করেছি, ভারতের চাঁদ পর্যন্ত যে যাত্রা তা ছিল খুবই কষ্টের। আমাদের এখনো মনে পড়ে, মার্স অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহে যখন প্রথম মঙ্গল যান পাঠানো হয়, তখন বাইরের দেশের অনেক মিডিয়া, আমাদের এই মঙ্গল মিশনকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেছিল, এমনকি কাটুন পোস্টারও বানিয়েছিল।

যেখানে দেখানো হয়েছিল যে একটি কৃষক গরু নিয়ে যাচ্ছে। এই পোস্টারের মাধ্যমে তারা আমাদেরকে এমনভাবে অপমান করেছিল, যে ভারত গরু নিয়ে চাঁদে যাচ্ছে, এমনকি এটাও বলছিল, ভারতের মানুষ খেতে পায়নি তারা আবার মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠাচ্ছে। সেই সময় আমাদেরকে নানান ভাবে ডি-মোটিভেটেড করার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু ভারত চাইলে ওই সময় পিছে হাঁটতে পারতো। কিন্তু তা করেনি, একের পর এক আমাদের দেশ নানান মিশন সাকসেস করে বিশ্বের অন্যান্য ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ভারতের স্পেস মিশন শুরু হয় বিশেষত ১৯৬২ সাল থেকে, National commitee for space research (INCOSPER) এই নামে।

এরপর কেরলের থুম্বা নামক জায়গায় , থুম্বা ইকুয়েটোরিয়াল রকেট লঞ্চিং স্টেশন ( TERLS ) নামে রকেট লঞ্চিং সিস্টেম বানানো হয়। এবং ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম রকেট লঞ্চ করা হয়। কিন্তু এই সময় ভারতের তুলনায় অন্যান্য দেশের স্পেস এজেন্সি গুলি অনেক বেশি ডেভেলপমেন্ট ছিল বা আপগ্রেটেড ছিল। আপনি ধারনা লাগাতে পারেন ১৯৭৬ সালে USSR সেই জায়গায় তাদের লুনার মিশন লঞ্চ করেছিল, তাহলে কতটাই ডেভলপমেন্ট স্পেস এজেন্সি ছিল।১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে National commitee for space research (INCOSPER) এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় I SRO অর্থাৎ Indian space research organisation.

রকেট লঞ্চে সাইকেল ও গরুর গাড়ির ভূমিকা

তো দেখুন কেন আমি টাইটেলে উল্লেখ করেছি ‘সাইকেল থেকে চাঁদ পর্যন্ত’, বিশেষত তৎকালীন ভারতের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না, তাই স্পেস সংক্রান্ত নানান ধরনের সরঞ্জাম, সাইকেলে করে এবং গরুর গাড়ি করে স্পেস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হতো। বর্তমানে চন্দ্রযান-৩ এর সাকসেসফুল ল্যান্ডিংয়ের পর, তৎকালীন স্পেস সেন্টারের জন্য নানান ধরনের ইকুইপমেন্ট, সাইকেলে এবং গরুর গাড়িতে নিয়ে যাবার একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় খুবই ভেসে বেড়াচ্ছে ।

মানুষ ওই ছবিগুলো দেখে হয়তো মনে মনে হাসছে, তখনোও মানুষ হয়তো মনে মনে ভাবতো, যে এইভাবে কিভাবে কাজকে সম্পূর্ণ করা যাবে, এটা মনে হচ্ছে সম্ভাব্য আর হবে না। কিন্তু তখনো মানুষ পিছে হাঁটেনি, নানান অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে তুলেছিল। তাই মাত্র ৪০ বছরের মধ্যেই ভারত স্পেস সংক্রান্ত নানান সাকসেস অ্যাচিভ করতে পেরেছে।

Aditya-L1 মিশন গগনযান মিশন

শুধু এই নয়, চন্দ্রযান-৩ এর সাকসেসফুল লেন্ডিং হওয়ার পর, ওই সময়েই ইসরোর প্রধান ঘোষণা করেন, এর পরের মিশন হচ্ছে Aditya-L1 , সূর্যকে জানার জন্য বা বোঝার জন্য লঞ্চ করা হবে। তিনার কথা মত Aditya-L1 কে এই বছর অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩এ সূর্যের উদ্দেশ্যে লঞ্চ করা হয়।

তিনি আরব ঘোষণা করেন, এরপরেই আমরা থেমে যাব না, আমাদের গগনযান মিশন (indian mission on mars) লঞ্চ করব। যেখানে মানুষকে স্পেসে পাঠানো হবে, নিজস্ব টেকনোলজির ওপরে ডিফেন্ড করে। তাহলে আপনি ভাবুন যে কত বড় চ্যালেঞ্জ হবে ইসরোর বিজ্ঞানীদের কাছে। এমনকি গভীর সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি মিশন তৈরি করা হচ্ছে। এর পরে পরে আরো অনেক কিছু করার রয়েছে, যা আপনারা ধীরে ধীরে জানতে পারবেন।

স্পেস মিশন সংক্রান্ত এত যে সাফল্য, তার অনেকটা ক্রেডিট যায় ভারতের মিসাইল ম্যান এপিজে আব্দুল কালাম এর উপর এবং বর্তমানে ইসরোর বৈজ্ঞানিকদের উপর। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এই সমস্ত সাফল্যকে অর্জন করতে পেরেছে।

Conclusion

তাই, যেই দেশেরই স্পেস সেন্টার কোন গ্রহ বা নক্ষত্র বা উপগ্রহকে পর্যবেক্ষণের জন্য কোন রকেট বা মিশন পাঠালে সেটিকে উপহাস করা চলবে না। এবং প্রয়োজন হলে মিশন পাঠানো দেশটি যদি অন্যান্য দেশের স্পেস সেন্টারের কাছে সাহায্য চাই, তবে ওই দেশের পাঠানো স্যাটেলাইটকে বা রকেটকে অবশ্যই প্রয়োজন মাফিক সাহায্য করতে হবে। কারণ সেই দেশ পাঠাতে পারে, কিন্তু পর্যবেক্ষণ করে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা শুধুমাত্র দেশি উপকৃত হয় না, বিশ্বের সমস্ত দেশই ওই তথ্য দ্বারা উপকৃত হয়।

তবেই আমাদের বিশ্ব নানান ধরনের দুর্যোগ বা সমস্যা থেকে অনেকটা সহায় হবে। কারণ পুরো পৃথিবী যদি ধ্বংস হয়, সেক্ষেত্রে কোন একটি দেশ ধ্বংস হচ্ছে না, পৃথিবীর সমস্ত দেশই ধ্বংস হচ্ছে। তাই পৃথিবীর বুকে কোন দুর্ঘটনা আসলে, দুর্ঘটনার কারণ যদি কোন দেশ জানতে পারে, তাহলে সেই দেশ যেমন ওই দুর্ঘটনার জন্য সচেতনতা অবলম্বন করবে, তেমনি অন্যান্য দেশকেও সতর্ক করতে হবে।

FAQ

Q) স্পেস মিশন বলতে কী বোঝায়?

কোন কিছু গবেষণার জন্য মহাকাশে যখন কোন স্যাটেলাইট পাঠানো হয়, তখন তাকে স্পেস মিশন বলে।

Q) স্যাটেলাইটকে কিসের সাহায্যে মহাকাশে প্রেরণ করা হয়?

যে কোনো স্যাটেলাইটকে রকেটের সাহায্যে মহাকাশে প্রেরণ করা হয়।

Q) ভারতের প্রথম স্যাটেলাইটের নাম কি এবং কবে প্রেরণ করা হয়েছিল?

ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট হলো আর্যভট্ট। যেটি ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে মহাকাশে লাঞ্চ করা হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *